কিভাবে যাকাতের নিসাব বের করা যায়?


যাকাত একটি ফরয ইসলামী বিধান। যা পালন করা অবশ্যই কর্তব্য। অর্থাৎ একজন মুসলমানের জন্য যাকাত দেওয়া না হলে তার গুনাহ হবে। যাকাত শব্দের অর্থ হচ্ছে বৃদ্ধি বা প্রসারন। সম্পদের বৃদ্ধি বা ব্যপ্তিকেই যাকাত বলা হয়েছে। যাকাত কিন্তু সবার জন্য ফরয নয়। শুধুমাত্র নিসাব পরিমান সম্পদ থাকলেই সেই পরিমান সম্পদের একটি নির্দিষ্ট পরিমানে যাকাত হিসেবে প্রদান করতে হয়। যাকাত দেয়ার আগে যাকাতের নিসাব বের করে নিতে হয়।

যাকাত বছরের যে কোন সময়েই দেয়া যায়। রমজান মাসে মুসল্লিরা এর হিসাব কিতাব নিয়ে বসেন কারন এই মাসটি অনেক দিক দিয়েই গুরুত্বপূর্ন। সিয়াম সাদনার মধ্যে দিয়ে আত্মার পাশাপাশি সম্পদের জন্য ইসলামী বিধান মোতাবেক পবিত্রতা অর্জনের চেষ্টা করেন।

কিভাবে যাকাতের নিসাব বের করা যায়?

যাকাত সবার উপরেই ফরয নয়। যারা নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক তাদের জন্য যাকাত ফরয।

নগদ অর্থঃ

ইসলামী নীতি অনুযায়ী গচ্ছিত সম্পদের(সোনা, রুপা, টাকা, বা আর্থিক যে কোন কিছু যেমন বৈদেশিক মূদ্রা) পরিমান যদি সাড়ে সাত তোলা সোনার বা সাড়ে ৫২ তোলা রুপার মূল্যের সমান বা তার বেশি হয় তবে তার থেকে আড়াই শতাংশ বা ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে।

একটি উদাহরন দেয়া যাক। বাংলাদেশে সোনার মূল্য ২১ক্যারেট(যেহেতু আমরা এই ক্যারেটের সোনা ব্যাবহার করি) এর জন্য প্রতি ১গ্রাম = ২৮৭৮.৮৪টাকা। সাড়ে ৭ তোলা = ৮৭.৪৮ গ্রাম (১ তোলা = ০.৩৭৫ ট্রয় আউন্স = ১১.৬৬৩৮০৩৮ গ্রাম)। তাহলে মোট নিসাবের পরিমান হয় = ২৫১৮৩৭টাকা। অর্থাৎ কারো যদি গত এক বছর ধরে গচ্ছিত অবস্থায় ২৫১৮৩৭টাকা থাকে তবে তিনি এর ২.৫% হারে মোট ৬২৯৬ টাকা যাকাত দিবেন। এখানে যাকাতের নিসাব হচ্ছে ২৫১৮৩৭টাকা।

আবার এক গ্রাম রৌপ্যের দাম বর্তমানে ৩৭.৭৫২৫টাকা। তাহলে সাড়ে ৫২ তোলা = ৬১২.৩৫ গ্রাম রৌপ্যের বর্তমান বাজার মূল্য ২১৮৯৩ টাকা। এটাকেও যাকাতের নিসাব ধরা হয়েছে। এই পরিমান গচ্ছিত অর্থ বা অলংকার বা সোনা, রুপা কিংবা যে কোন ধরনের সঞ্চয় থাকলেও তা যাকাতের নিসাবের মধ্যে গন্য হবে। এখান থেকেও আড়াই শতাংশ বা ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে। এখানে যাকাতের নিসাব হচ্ছে ২১৮৯৩টাকা।

 

বানিজ্যিক সম্পদের ক্ষেত্রে লভ্যাংশের কথা বলা হয়েছে যদি তা উপরের যে কোন পরিমান অতিক্রম করে তবে যাকাত দিতে হবে।

গবাদি পশুর ক্ষেত্রে যেমন গরু মহিষ যদি ২৯টির কম হয় তবে যাকাত দিতে হবে না। যদি ৩০ বা তার অধিক ৩৯টি হয় তবে ১ বছরের একটি বাচুর যাকাত হিসেবে দিতে হয়। ৬০টি বা ততোধিক এর জন্য প্রতি ৪০টির বেলায় ২বছের একটি বাচুর এবং প্রতি ৩০টির জন্য ১ বছরের একটি করে বাচুর যাকাত দিতে হয়।

ছাগল বা ভেড়ার ক্ষেত্রে ৩৯টি পর্যন্ত যাকাত দিতে হবে না। ৪০ টি থেকে ১২০টি তার থেকে একটি করে যাকাত দিতে হবে। ১২১ থেকে ২০০টি এর জন্য ২টি, ২০১টি থেকে ৩০০টি পর্যন্ত ৩টি, এর অতিরিক্ত প্রতি ১০০টি থেকে ১টি করে যাকাত দিতে হবে।

 

বানিজ্যিক উদ্যশ্যে বাড়ি, জমি, মাছ বা হাঁস মুরগী অথবা যে কোন পাখি পালনের ক্ষেত্রে তা যদি সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্যের বাজার মূল্যের সমান বা অতিক্রম করে তবে তার থেকে আড়াই শতাংশ বা ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে।

প্রভিডেন্ট ফান্ড বা যে কোন ব্যক্তিগত উদ্যোগেও যদি কোন সঞ্চয়ী ফান্ড করা হয়ে থাকে তবে তার পরিমান যদি সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্যের সমান বা বেশি মূল্যের হয় তবে তার থেকে আড়াই শতাংশ বা ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে।

 

উৎপাদিত কৃষিজাত ফসলের ক্ষেত্রে যদি তা বৃষ্টির পানি দ্বারা চাষ করা হয়ে থাকে তবে ১/১০ অংশ যাকাত দিতে হবে। অন্য দিকে যদি সেচের পানিতে চাষ করা হয়ে থাকে তবে ১/২০ অংশ যাকাত দিতে হয়।

খনিজ দ্রব্য উত্তোলনের ক্ষেত্রে যে কোন পরিমান উত্তোলনকৃত খনিজের শতকরা ২০ভাগ যাকাত দিতে হয়।

উপরে উল্যেখিত নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক হবার পর এক বছর পূর্ন হলেই যাকাত ফরয হবে। যাকাতের নিসাব বের করার সময় বর্তমান বাজার মূল্য হিসেবে যাচাই করতে হয়। যাকাতের পরিমানও একই মূল্যের উপর প্রদান করতে হয়।

 

যাকাতের অর্থ কোথায় প্রদান করবেন?  

যাকাতের অর্থ চাইলেই যে কোন জায়গায় প্রদান অথবা দান করা যাবে না। ইসলামে এর জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। নিচে যাকাত প্রদানের খাত সমূহ উল্যেক করা হলো। মোট আট টি খাতে যাকাত প্রদানের বিধান রয়েছে।

 

১। ফকির হচ্ছে সেই ব্যাক্তি যার নিসাব পরিমান সম্পদ নেই। তার হাত খালি কিংবা সে দারূন অভাবগ্রস্ত। হয়ত সে ভিক্ষা করে কিংবা ভিক্ষা করে না, তাকে যাকাতের অর্থ প্রদান করতে হবে। যে ব্যক্তি তার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারে না। সেই ফকির।

 

২। মিসকিনঃ যার কিছুই নেই সেই মিসকিন। মিসকিনের এক বেলা খাবারও থাকে না। তাই যাকাতের অর্থ মিসকিনের প্রাপ্য। তাকে দিতে হবে।

 

৩। যাকাত প্রদানের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে যাকাত থেকেই বেতন ভাতা দেয়া যাবে। যারা ফান্ড গঠন করে কিংবা ফান্ডের অর্থ বন্টন করে তারা ফকির মিসকিন না হলেও বেতন বা ভাতা হিসেবে যাকাতের মূল ফান্ড থেকে অর্থ নিতে পারবেন।

 

৪। অন্যান্য ধর্মীয় যারা ইসলামকে ভাল নজরে দেখেন অথচ যাদের কাছে নিসাব পরিমান অর্থ নেই তাদেরকে যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।

 

৫। কৃতদাস বা কৃতদাসী অথবা বন্দী মুক্তির জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।

 

৬। ঋনগ্রস্থ ব্যক্তিকে যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।

 

৭। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কিংবা কোন সম্বলহীন মুজাহীদের যুদ্ধাস্ত্র কিংবা অসহায় ছাত্রের জন্য যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।

 

৮। অসহায় মুসাফির যদি খুব বিপদে পড়ে যান, যাত্রাপথের খরচ কিংবা অন্যান্য সাহায্যের জন্য বা চিকিৎসা করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।

 

শেষ করার আগে কিছু কথাঃ আমাদের দেশের নানা সময়ে খবর হয়ে কাগজে কিংবা টিভিতে দেখা যায়, যাকাতের শাড়ি বা লুংগির জন্য পদপিষ্ট হয়ে কিছু গরীব মানুষের মৃত্যু হয়। এর জন্য যিনি যাকাতের সেসব পন্য বিতরন করেন তিনিই দ্বায়ী থাকবেন। কারন যাকাতের অর্থ বন্টনের জন্য সুস্থ্য কিছু পদ্ধতি আছে। আর যাকে তাকে যাকাত দেয়াও নিষেধ। আশাকরি তাদের পরিবর্তন হবে। যাকাত এর অর্থ প্রদানের বা বন্টনের জন্য তারা উপরের তালিকা দেখে গুরুত্ব অনুসারে খাত সমূহ নির্বাচন করবেন। নিজে ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে বা পাঠিয়ে যাকাত প্রদান নিশ্চিত করবেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*